All for Joomla The Word of Web Design

ঠিকানার শেষ প্রান্তে

সুমাইয়া বিনতে রাশিদ
লেখিকা, মাই ইসলাম, মাই নিউজ।

শান্তির পরশে প্রকৃতি আজ প্রশান্ত। নির্জন সুনসান পরিবেশে স্নিগ্ধ মায়াময় বাতাসে অনেক আবেগ নিয়ে অন্ধকার পথে হেটে যাচ্ছে আব্দুল্লাহ। তার স্মৃতিচারণে ভেসে উঠল তার জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাগুলো একেক করে। দুনিয়ার জিন্দেগী অসাড় মনে হতে লাগল তার কাছে। শিরায় শিরায় তার রক্তের মিছিল শুরু গেল সেই মিছিল যেন ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মনে মনে ভাবছে এই দুনিয়া আমার জন্য নয়। গন্তব্যহীনভাবে শুধু হেটেই চলছে , যার আগেও কেউ নেই পিছনেও কেউ নেই। হঠাৎ তার প্রিয় মসজিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আর কিছু না ভেবেই ভিতরে চলে গেল। স্বলাতে দাঁড়িয়ে গেল। আর অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগল মনে হচ্ছে যেন সে তার রবের কাছে সকল আকুতি মিনতি তার অশ্রুতেই প্রকাশ করছে। সেজদায় লুটে গেল সে, দীর্ঘক্ষণ ধরে স্বলাত পড়ে মসজিদের দেয়ালে মাথা হেলান দিয়ে বসল, আর ভাবতে লাগল, ‘কীভাবে মানুষ বহুমুখী হয়? মানুষ এতো অত্যাচারী, নিষ্ঠুর কীভাবে হয়?

মা মারা যায় আব্দুল্লাহ জন্মের সময়। তখন থেকেই বাবা, চাচা ও চাচীর সাথে থাকত। বাবা সরকারী চাকরী করত তাই অফিসের কাজে তাকে বেশিরভাগ সময় বাইরে যেতে হত। আব্দুল্লাহর চাচাতো ভাই ইব্রাহীম তার সমবয়সী, তাই দুইজন সবসময় এক সাথেই থাকত। আব্দুল্লাহর মায়ের খুব ইচ্ছে ছিল তাকে মাদ্রাসায় পড়াবে। হাফেজ বানাবে, তাই আব্দুল্লাহ পড়তো মাদ্রাসায় আর ইব্রাহীম পড়তো স্কুলে। ইব্রাহীমের আচারণ ছিল একটু উগ্র স্বভাবের, সে খুব অল্প বয়সে নেশাযুক্ত হয়ে পড়ে। আব্দুল্লাহ যখন এগুলো ইব্রাহীমের মায়ের কাছে জানায় ইব্রাহীমের মা উল্টা আব্দুল্লাহকে অনেক বকা দেয় এবং মিথ্যা কথা বানিয়ে চাচাকে বলে দেয়। চাচা ভীষণ রেগে তাকে মারধর করে। পরিবারের এই অসহনীয় আচরণেও সে কখনো হার মানে না। আল্লাহর উপর যার বিশ্বাস অটুট সে কিভাবে এসবে হার মানবে? এতোকিছু হয়ে গেলো কিন্তু আব্দুল্লাহ কখনো তার বাবার কাছে এই নিয়ে কিছু বলেনি।

তার জীবনের দুঃখের ছায়া এখনো চলে যায় নি। একদিন আব্দুল্লাহর বাবা খুব অসুস্থ হয়ে যায়। হাসপাতালে নেয়ার পরপরই আব্দুল্লাহর বাবা বিদায় নেই এই দুনিয়া থেকে। এক অধ্যায় শেষ না হতেই নতুন অধ্যায় শুরু হলো। চাচা চাচীর অমানবিক আচরণ দিনদিন বাড়তেই থাকে। এসব সহ্য করতে না পেরে বাসা ছেড়ে বের হয়ে যায় সে। থাকার জন্য জায়গা না পেয়ে রাস্তায় তাকে থাকতে হয়। একদিন, দুইদিন পার হয়ে যায়। এক সময় ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা শুরু হল তার। উপায়ান্তর না দেখে একটি হোটেলে গিয়ে কিচ্ছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাদের কাছে কিছু খাবার চাইল, কিন্তু তারা খাবার না দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। সেই ক্ষুধা নিয়ে আবার রাস্তায় শুয়ে পড়ল তখনি দেখল কিছু ছেলে একটি মেয়েকে উত্যক্ত করছে। সে ছেলেগুলোর মধ্যে তার ভাই ইব্রাহীম ও ছিল। আব্দুল্লাহ দৌড়ে গিয়ে ছেলেগুলোকে বাধা দিলো, কিন্তু নেশাগ্রস্ত ছেলেগুলো আব্দুল্লাহ কথা না শুনে তাকে অনেক মারধর করে। কোথাও কেউ নেই। না পরিবারে, না এই সমাজে। তার কোন বাড়ি নেই। নেই কোন পরিচয়। নেই কোন ঠিকানা যেখানে সে ঠাঁই পাবে।

এসব ভাবতে ভাবতে মসজিদের ইমাম সাহেব এসে আব্দুল্লাহর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, কান্না করো না, এই দুনিয়া তো তোমার আসল বাড়ি না, এই দুনিয়া তো পরীক্ষার হল। তোমাকে তো তোমার রবের কাছে ফিরে যেতেই হবে, তুমি তোমার আহ্বানে সাড়া দাও, তিনি তোমাকে পথ দেখাবেন। আবার দু’রাকাত স্বলাত পড় দেখবে দুঃখগুলো অনেকটাই কমে যাবে।

আব্দুল্লাহ এবার কিছুটা শান্ত হল এবং ভাবল আসলেই তো, এটা তো আমার আসল বাড়ি নয়, দুনিয়া তো আমার ঠিকানা নয়। আমার ঠিকানা তো পরকাল। এই বলে আব্দুল্লাহ দাঁড়িয়ে স্বলাত পড়া শুরু করল। সে এতো বেশি আন্তরিকতার সাথে স্বলাত পড়ছে দেখে মনে হচ্ছে হয়ত সে আল্লাহর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করছে। নিজের সব মান অভিমান আল্লাহকে অভিব্যক্ত করছে। সেজদায় লুটে পড়ে, সে যেন দুনিয়ার সব সুখ পেয়ে গেলো। সেজদা থেকে উঠার কথা হয়ত সে ভুলেই গেছে অনেকক্ষণ সিজদায় আল্লাহর শোকর গুজার করছে। দেখে মনে হচ্ছে সে চাচ্ছে না সিজদা থেকে আবার এই দুনিয়ার মুখ দেখতে। সে নিজেকে যেন আল্লাহর সামনে বিলীন করে দিল। প্রায় দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর যখন আব্দুল্লাহ সিজদা থেকে উঠল না ইমাম সাহেব গিয়ে তার গায়ে হাত দিয়ে ডাকলেন, আব্দুল্লাহ! সাথে সাথে আব্দুল্লাহ জমিনে পড়ে গেলো। মায়াভরা সেই মুখ, এক অম্লান হাসি তার মুখে। এই মিথ্যা দুনিয়া থেকে বিদায় নিল আব্দুল্লাহ। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় নিজের আসল ঠিকানা পেল না তাই পাড়ি দিল নিজের আসল ঠিকানা খুঁজতে। তার হাসি দেখে মনে হচ্ছে আল্লাহ হয়ত তার দুনিয়ার সব অপূর্ণ চাওয়া-পাওয়াগুলো পূরণ করে দিয়েছেন। সে পেয়ে গেছে তার আসল ঠিকানা ।

  • জেএমএম

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   পরকালের জন্য হোক কিছু সঞ্চয়   ❖   কোনো এক ক্ষণে   ❖   ঠিকানার শেষ প্রান্তে   ❖   অন্যরকম বিয়ে   ❖   ভাগ্যকে আশীর্বাদ করুন দোষারোপ নয়   ❖   সত্যের পথে   ❖   কওমি সনদ, হাইআতুল উলইয়া, বেফাক ও অন্যান্যদের দলাদলি: একটি পর্যালোচনা   ❖   ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত যুদ্ধের পেছনে আমেরিকার খরচ ৫.৬ ট্রিলয়ন ডলার!   ❖   ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি পরকীয়া   ❖   আরবের দুম্বা সমাচার