All for Joomla The Word of Web Design

কওমি সনদ, হাইআতুল উলইয়া, বেফাক ও অন্যান্যদের দলাদলি: একটি পর্যালোচনা

মাহমুদ মুজিব

আল্লামা আহমদ শফি সাহেবের নেতৃত্বে সকল শিক্ষাবোর্ড ঐক্যবদ্ব হওয়ার মধ্য দিয়ে সনদের সরকারী স্বীকৃতি নিয়ে তুলকালাম ও বিতর্কের অবসান ঘটে। তার আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকটা সাংঘর্ষিকও। ব্যক্তি নিয়ে মাতামাতি। বোর্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব। নেতৃত্বের ব্যাপারে অনৈক্য। মধ্যস্হতাদের প্রতি অনাস্হা। তারও আগের অবস্হা ছিলো আরো নাজুক। একপক্ষ স্বীকৃতি নিতে মরিয়া। অপরপক্ষ স্বীকৃতি নেয়া হারাম ভাবতেন। স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যতা বিনষ্টের অযুহাত দেখাতেন। তারা দেওবন্দের মরহুম মরগুবুর রহমান সাহেবের ফতোয়া প্রচার করতে লাগলেন জোরেশোরে। তার সাথে মুফতি আব্দুর রহমান সাহেবের একটা বক্তব্য গনহারে ছাপিয়ে বিতরণ করছেন। অথচ যারা ইতিপূর্বে হযরতের ওফাত পর্যন্ত কোন বিষয়েই হযরতের সাথে একাত্মতা পোষন করতেননা। এমনকি হযরতের সম্পৃক্ততা বা তত্বাবধান সহ্য করতেন বলে মনে হতোনা। যাইহোক অবশেষে স্বীকৃতি নেয়ার ব্যাপারে সকলে একমত। ওস্তাদুল ওলামা আল্লামা শাহ আহমদ শফি সাহেবের নেতৃত্বে, সরকারের আওতাবহির্ভূত হবে এ স্বীকৃতি।

(সনদ নিলে লাশ পড়া, অমুক সরকার থেকে স্বীকৃতি নেবোনা) এমন সিদ্ধান্তে অবিচল থেকে হঠাৎ করে সকলে সনদ নেয়া ও সরকারের সাথে গণভবনে সাক্ষাতকার দেয়ার বিষয়ে অনেকে অনেক কিছু বলছেন। ব্যক্তিবিশেষকে দোষছেন। আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। সেদিকে যাওয়া অপ্রয়োজন মনে করছি। কমিটি গঠনের সময় হলো। কো চেয়ারম্যান পদ ও প্রতিটি বোর্ড থেকে কতজন সদস্য করা হবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব লাগলো। কমিটি গঠনের পর ১১ এপ্রিল ২০১৭ ইং গণভবনে শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম ও বোর্ড প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই মর্মে ঘোষনা দেন যে, “কওমী মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ও দারুল উলূম দেওবন্দের মূলনীতিসমূহকে ভিত্তি ধরে কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদকে মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবী) এর সমমান প্রদান করা হল ৷”

দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণার পর ১৫ মে ২০১৭ প্রথমবারের মতো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আল হাইআতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমীয়া বাংলাদেশের অধীনে মোট ১৯ হাজার ৩৯৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। পরীক্ষা গ্রহণের পর স্বীকৃতির আইনগত ভিত্তি অর্জনের লক্ষ্যে লেয়াজো কমিটি দুয়েকবার সরকারের সাথে বসছেন। সরকার একটা গঠনতন্ত্র, শিক্ষা সিলেবাস চাইলেন। লেয়াজো কমিটি তা উপস্হাপন করলেন। হাইআতুল উলইয়ার জন্যে সরকার জমি বরাদ্দের ঘোষনা দিলেন।

পরবর্তীতে মঞ্জুরী কমিশন আইনের খসড়া তৈরি করার লক্ষ্যে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের ডিজি এবং ইউজিসির ৪জনকে কে অন্তর্ভুক্ত করে একটি কমিটি ঘোষনা করেন৷ যে কমিটিতে হাইয়াতুল উলইয়ার কোনোও প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি। গত ৯/১১/২০১৭ ইং তারিখ বেফাক ছাড়া অন্য ৫টি বোর্ডের দায়িত্বশীলগন বেফাকের প্রতি অনিয়ম ও একক সিদ্ধান্তের অভিযোগ এনে ইত্তেহাদ মহাসচিব আল্লামা আব্দুল হালিম বেখারীর সভাপতিত্বে চট্টগ্রামে মিটিং করেন। ৫ বোর্ড ৫টি সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারের সামরিক সচিবের সাথে বৈঠকে বসেন। সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনা করতে গিয়ে কেউ কেউ খুব অতিরন্জন করে ফেললেন। অন্যান্য ৫ টি বোর্ডকে তুচ্ছতাচ্ছল্য শুরু হলো। আর কেউ বেফাককে একতরফা দোষারুপ করতে লাগলো।

বেফাক সাপোর্টাররা বলছেন- বেফাক শীর্ষ বোর্ড, সর্বপ্রাচীন বোর্ড, মাদরাসা ও পরীক্ষার্থী বিবেচনায় বেফাক সবার উর্ধ্বে। বলা হয় অন্য বোর্ডগুলো আঞ্চলিক আর বেফাক হলো জাতীয় বোর্ড। তাই বেফাকের ক্ষমতা ও অধিকার বেশী। যে যাই বলুক একথা সর্বজনসম্মত যে, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াহ বর্তমানে শীর্ষ বোর্ড। প্রচার ও প্রকাশনায় বাকি সব বোর্ড থেকে অনন্য ও উচ্চতায়। রেজাল্ট প্রকাশ অনলাইন সমৃদ্ধকরণ হয়েছে। এটা বেফাকের সফলতা বলা চলে। তবে একথাও মনে রাখতে হবে-বাংলাদেশ কওমি শিক্ষা নিয়ে আগ থেকে কয়েকটি বোর্ড ছিলো- আজাদ দ্বীনি এদারা, ঈত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ( ১৯৫৯), তানযিমুল মাদারিসিরল কওমিয়্যাহ, এসব বোর্ড না হলে বেফাকুল মাদারিসের অস্তিত্ব ও প্রতিস্ঠা কল্পনাও করা যেতোনা। কারন- এসব বোর্ড আগ থেকে সক্রিয় ছিলো। আজাদ দ্বীনি এদ্বারা সর্বপ্রাচীন বোর্ড, এরপর প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইত্তেহাদুল মাদারিস, তানযিমুল মাদারিস, তারপরেই বেফাকুল মাদারিসের প্রতিষ্ঠা।

তন্মধ্যে ১৯৫৯ ইং সনে আল জামেয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া চট্টগ্রামের মুহতামিম শায়খুল আরব ওয়াল আজম হাজী মুহাম্মদ ইউনুস সাহেব এর তত্বাবধানে ইত্তেহাদুল মাদরিস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আর ১৯৭৮ ইং সনে বেফাকুল মাদারিসের প্রতিষ্ঠা হয় ইত্তেহাদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিরই তত্বাবধানে। পটিয়ার মুহতামিম হাজী সাহেব হুজুর আমৃত্যু ইত্তেহাদের পাশাপাশি বেফাকেরও সভাপতি ছিলেন। উনার ইন্তেকালের পর পটিয়ার পরবর্তী মুহতামিম আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী ইত্তেহাদ ও বেফাকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তিনি বেশীদিন বেফাকে সম্পৃক্ত থাকতে পারেননি। পরবর্তীতে ইত্তেহাদ ও জামেয়া পটিয়া বেফাককে আর ধরে রাখতে পারেননি এটা তাদের ব্যর্থতা। বেফাক কার্যালয়ের জমিটি জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়া ও ইত্তেহাদুল মাদারিসের ফান্ডে কেনা।

পরবর্তিতে অফিস নির্মানের লক্ষ্যে জামেয়া দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইত্তেহাদুল মাদারিসের বর্তমান সভাপতি আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী সৌদিয়ার এক সংস্হাকে দরখাস্ত করলে ইট, রড, সিমেন্টের ব্যবস্থা হয়। এসবের প্রমাণ ও সাক্ষীরা এখনো জীবিত আছেন। সুতরাং এসব অবদান ও ইতিহাস অস্বীকার করা বেফাকের অতিউৎসাহী সাপোর্টারসদের পক্ষে বেমানান, অসুন্দর, অসম্ভবও বটে।

৫ বোর্ডের সমর্থকরা মিটিং নিয়ে যেমন মনে করছেন ঠিক তেমন নয়। বেফাকের প্রতি এসব অভিযোগ সরাসরি বেফাকের কর্নধার ও যথাযথ দায়িত্বশীলদের জানালে সমাধান হতো। সরকার সংশ্লিষ্টদের জানানোর প্রক্রিয়াকে অতি সাপোর্ট না দেয়া সমীচীন হবে। এখানে একটা বিষয় বলে রাখি- বেফাকুল মাদারিস যদিও ইত্তেহাদুল মাদারিসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কিন্ত তার বর্তমান অবস্হান ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় তাদের সম্মান প্রদর্শন করা দরকার।

সবশেষে যেটা মনে হয়- বেফাক ও ৫ বোর্ড দ্বন্দ্বে বিতর্ক না করাটাই ভদ্রতার বহিঃপ্রকাশ। আর এ বিতর্কের অবসান ঘটাতে ৬ বোর্ডের দায়িত্বশীলগন আবারও একটেবিলে বসতে হবে। তাহলে পরস্পর দোষাদোষি বন্ধ হবে। ছোটোখাটো মতপার্থক্যের কারনে সনদের স্বীকৃতি যেনো থেমে না যায় এটাই কামনা থাকবে। আর স্বীকৃতির নামে যেনো কোন বিকৃতি না হয় সেদিকটিও লক্ষ্য রাখতে হব। সকলের স্লোগান এটা হওয়া চাই- সকল উলামায়েকেরাম আমাদের। সকল কওমী শিক্ষাবোর্ডও আমাদের। আমরা একে অপরের। সকলে সকলের।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   পরকালের জন্য হোক কিছু সঞ্চয়   ❖   কোনো এক ক্ষণে   ❖   ঠিকানার শেষ প্রান্তে   ❖   অন্যরকম বিয়ে   ❖   ভাগ্যকে আশীর্বাদ করুন দোষারোপ নয়   ❖   সত্যের পথে   ❖   কওমি সনদ, হাইআতুল উলইয়া, বেফাক ও অন্যান্যদের দলাদলি: একটি পর্যালোচনা   ❖   ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত যুদ্ধের পেছনে আমেরিকার খরচ ৫.৬ ট্রিলয়ন ডলার!   ❖   ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি পরকীয়া   ❖   আরবের দুম্বা সমাচার