All for Joomla The Word of Web Design

মসজিদে নববীর জুমার খুতবা

অশ্লীলতার কাছেও যেও না

শাইখ আবদুল বারী আস-সুবাইতি

সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বলেছেন, ‘যারা ঈমান আনে, অতঃপর নিজেদের ঈমানের সাথে শিরকের মিশ্রণ ঘটায় না, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’
ইসলাম প্রশান্ত জীবন, নিরাপত্তা ও শান্তির বিধান দিয়ে মানুষকে সম্মানিত করেছে। ইসলামি শরিয়াহর সব বিধানে রয়েছে ব্যাপকতা। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে উন্নত মূল্যবোধ দ্বারা পরিবেষ্টন করে নিয়েছে। যাতে রয়েছে উত্তম চরিত্র ও আমল। যে মূল্যবোধ তাদের সুরক্ষা দেয় মন্দ কাজ ও আচরণ থেকে।
ইসলামের জীবনদর্শন পরিপূর্ণ। তাই এটি আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবনদর্শন। আল্লাহ বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম আর ইসলামকে তোমাদের জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করে নিলাম।’
ইসলামী জীবনবিধানের অন্যতম ভিত্তি হলো তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহকে যথাযথ ভয় করো এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’
ইসলাম ও ইসলামের শিক্ষা সব ধরনের অন্যায় ও অপরাধকে তার উৎসমূলেই বাধা দিয়েছে। তার সামনে দুর্ভেদ্য প্রাচীর দাঁড় করে দিয়েছে যেন ব্যক্তি ও সমাজ অন্যায় ও অপরাধ থেকে মুক্ত থাকে।
ইসলাম এক দিকে উন্নত নৈতিক মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করেছে, উত্তম চারিত্রিক গুণাবলির বিকাশ ঘটাতে প্রেরণা দিয়েছে, অন্য দিকে সব অপরাধ, অন্যায় ও মন্দ স্বভাব চরিত্রের উৎসগুলোকে বাধা দিয়েছে।
ইসলামী শরিয়াহ দণ্ডবিধি, কিসাস ও ফৌজদারি অপরাধের শাস্তিবিধান দিয়েছে, যেন সমাজে সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কিসাস তথা হত্যার শাস্তিতে হত্যার বিধান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য কিসাসে রয়েছে জীবন, হে জ্ঞানসম্পন্ন লোকজন। আশা করা যায় তোমরা তাকওয়া অর্জন করবে।’
বর্তমান সময়ে একটি ভয়াবহ অপরাধ সমাজকে কলুষিত ও আতঙ্কিত করে তুলেছে আর তা হলো ইভটিজিং অর্থাৎ যৌন হয়রানি। এটি মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে বিনষ্ট করছে। যৌন হয়রানি একটি নিকৃষ্ট ও জঘন্য কাজ। একটি ঘৃণিত আচরণ।
এ অপরাধের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। এটি সমাজের নৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করে দেয়। এ জঘন্য অপরাধটি ভুক্তভোগীকে মানসিকভাবে এমন বিপর্যস্ত করে দেয় যে, অনেক সময় তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।
যৌন হয়রানিকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া আমাদের ওপর শরিয়াহর পক্ষ থেকে ন্যস্ত দায়িত্ব।
আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয় এমন বিষয়ে যা তারা করেনি, তারা তো মূলত মিথ্যা ও স্পষ্ট অপবাদের বোঝাই বহন করে চলে।’ (আল আহযাব: ৫৮)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো ওই ব্যক্তি যাকে লোকেরা তার অশ্লীল আচরণের কারণে ভয় করে।’
যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া মূলত আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে যে জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায় তাকে বাধা দেয়া হয়।
অপর দিকে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার মাধ্যমে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা পায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জমিনে একটি হদ্্ তথা শরিয়াহ প্রবর্তিত দণ্ড কার্যকর করা চল্লিশ দিনের বৃষ্টিবর্ষণ থেকে উত্তম।’
কুরআন মুমিনদেরকে ডেকে বলছে তারা যেন শয়তানের অনুসরণ থেকে দূরে থাকে। শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অশ্লীলতার কাছেও যেও না, তা প্রকাশ্য হোক অথবা গোপনীয়।’ (আল আন‘আম: ১৫৩)
তিনি আরো বলেন, ‘হে যারা ঈমান এনেছো, শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। তোমাদের মধ্যে যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সে যেন জেনে রাখে যে, সে তো তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের আদেশ করে।’ (আন-নূর: ২১)
কুরআনী এ আহ্বানের উদ্দেশ্য হলো, অনিষ্টের সব ফাঁক বন্ধ করা। মুমিন সমাজে যারা অশ্লীলতা ছড়ায় তাদেরকে বাধা দেয়া। ইভটিজিং তথা যৌন হয়রানি একটি নিকৃষ্ট আচরণ। এটি তারাই করে যারা মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত, ব্যক্তিত্বহীন, ভদ্রতা ও সভ্যতাবর্জিত।
যৌন হয়রানি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন, অশ্লীল কথা বলা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা অশ্লীলতাকে পরিহার করো, কেননা আল্লাহ অশ্লীলতা ও অশ্লীলতাকারীকে পছন্দ করেন না।’
তিনি আরো বলেন, ‘গালমন্দকারী, অভিশাপদানকারী এবং অশ্লীলতাকারী ব্যক্তি মুমিন নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তানই কিছু না কিছু জিনায় লিপ্ত। দু’চোখ জিনা করে, আর এ জিনা হলো দৃষ্টি। দু’হাত জিনা করে, আর এ জিনা হলো, হাত দিয়ে ধরা। দু’পা জিনা করে, আর এ জিনা হলো, এ উদ্দেশ্যে পথচলা। মুখের জিনা, আর তা হলো, চুমু দেয়া।’
মানুষ যখন তার জিহ্বাকে অনর্থক ও মন্দ কথায় লাগিয়ে দেয়, তখন সে নিজেকে দুনিয়া ও পরকালের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।
আল্লাহ বলেন, ‘মুখ দিয়ে যে কথাই বের হয়, তার জন্য রয়েছে পর্যবেক্ষক।’
যৌন হয়রানি এমন একটি ব্যাধি যা বর্তমানে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অথচ নিকট অতীতে এটি তেমন পরিচিত ছিল না। বর্তমানে এ নোংরা ব্যাধিটি সমাজে ব্যাপকভাবে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। এটি সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি ও স্বভাববিরোধী কাজ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব নোংরা ও অশ্লীল বিষয় প্রচার ও প্রদর্শন করা হচ্ছে, তাও একধরনের যৌন হয়রানি। কারণ, এর উদ্দেশ্যই হলো, সমাজে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো।
আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাতে চায়, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে পীড়াদায়ক শাস্তি। আল্লাহ সব বিষয়ে জানেন, আর তোমরা কিছুই জান না।’ (আন-নূর: ১৯)
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় যারা অশ্লীলতা ছড়ায় তাদের পরিণাম ও পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। আল্লাহ বলেন, ‘তারা তাদের পৃষ্ঠদেশে নিজেদের পাপের বোঝা বহন করবে।’ (আল-আন‘আম: ৩১)
তিনি আরো বলেন, ‘তারা বহন করবে নিজেদের পাপের বোঝা এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো বোঝা।’ (আল-আনকাবুত: ১৩)
এক দিকে পরিবার ও সমাজের অবহেলা, অন্য দিকে সৌন্দর্যের প্রদর্শনীর কারণে যৌন হয়রানি ব্যাধির প্রসার ঘটছে। পরিবারের অভ্যন্তরে ¯েœহ-মমতার ঘাটতির কারণেও তরুণীরা এমনকি শিশুরাও যৌন হয়রানির সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে।
শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও চিন্তাশীল লোকদের জানতে হবে যে, এ জঘন্য ব্যাধি ঠেকানোর সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে, দীনি চেতনা সৃষ্টি, ঈমানকে দৃঢ়করণ, কুরআনের দিকনির্দেশনা অনুসরণ, সর্বোপরি কথা ও কর্মে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা। দৃষ্টিকে অবনত করে চলা, শালীন পোশাক পরিধান, আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জন এবং মনের মধ্যে আল্লাহর ভয় পোষণ।
আমাদের সবার কাছে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, যুবকরা শক্তি ও সাহসের প্রতীক। তারা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা পায় তাহলে তারা তাদের মেধা, প্রতিভা ও যোগ্যতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারবে। তাদের চিন্তা-চেতনার উন্নতি ঘটবে। তারা কল্যাণ ও গঠনমূলক কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করবে। আর এভাবেই সমাজ যৌন হয়রানির ব্যাধি থেকে সুরক্ষা পাবে।
পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যকার অবস্থান সম্পর্ক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও উন্নত চরিত্র গড়ার মাধ্যম। এ সম্পর্ক তাদেরকে নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলা থেকে বাধা দেয়। তরুণীদেরকে পোশাকসহ শোভনীয় চালচলনে অভ্যস্ত করে তোলে।
যেসব পরিবারে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে, সেসব পরিবার যৌন হয়রানির সূতিকাগার। এসব পরিবারের সন্তানরা যৌন হয়রানিতে লিপ্ত হয় অথবা যৌন হয়রানির শিকার হয়।
বিয়ের বয়স হলে বিয়ে করানো ও বিয়ে দেয়া যৌন হয়রানির একটি প্রতিষেধক। বিয়ের মাধ্যমে যৌনাকাক্সক্ষা সুসংবদ্ধ হয়। অশ্লীলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে। কেননা এটি চোখকে সংযত ও লজ্জাস্থানের সংরক্ষণে সবচেয়ে কার্যকরী উপায়।’
সন্তানদের চরিত্র রক্ষায় আমাদেরকে গুরুত্বের সাথে যতœশীল হতে হবে। কোনো অবস্থায়ই এ বিষয়ে অবহেলা করা যাবে না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে, যখন চরিত্র বিধ্বংসী উপায়-উপকরণ চারদিকে সহজলভ্য হয়ে আছে।
যৌন হয়রানিসহ সমাজে বিদ্যমান সব ধরনের অপরাধ প্রতিহত করা সমাজের সামষ্টিক দায়িত্ব। সমাজের সব স্তরের মানুষকে এতে অংশগ্রহণ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, এমনও হতে পারে যে, কারো কারো কাছে কুরআন ও ঈমানের আহ্বান পছন্দনীয় নয়, তাদেরকে দমন করতে হবে শাসনের মাধ্যমে।
উসমান রা: বলেছেন, ‘আল্লাহ কখনো কখনো কুরআন দিয়ে যা দমন করা যায় না, তা শাসনের মাধ্যমে দমন করেন।
অনুবাদ : অধ্যাপক আ ন ম রশীদ আহমাদ

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   পরকালের জন্য হোক কিছু সঞ্চয়   ❖   কোনো এক ক্ষণে   ❖   ঠিকানার শেষ প্রান্তে   ❖   অন্যরকম বিয়ে   ❖   ভাগ্যকে আশীর্বাদ করুন দোষারোপ নয়   ❖   সত্যের পথে   ❖   কওমি সনদ, হাইআতুল উলইয়া, বেফাক ও অন্যান্যদের দলাদলি: একটি পর্যালোচনা   ❖   ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত যুদ্ধের পেছনে আমেরিকার খরচ ৫.৬ ট্রিলয়ন ডলার!   ❖   ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি পরকীয়া   ❖   আরবের দুম্বা সমাচার