All for Joomla The Word of Web Design

মক্কা শরীফের জুমার খুতবা

হজের ইতিহাস ঐতিহ্য শিক্ষা ও তাৎপর্য

শায়খ ড. মাহের মুআইকেলী।

মুহতারাম হাজীগণ! হারামাইন শরীফাইনের এ ভূখণ্ডে আপনাদের আগমন সুখকর হোক। তৃপ্তিদায়ক হোক আপনাদের ভ্রমণ। পৃথিবীর দূর দূরান্ত থেকে আল্লাহ্ আপনাদেরকে বাঁছাই করে ইসলামের বৃহৎ একটি স্তম্ভ হজ আদায়ের জন্য এ পবিত্র ভূখণ্ডে আসার তাওফিক দান করেছেন।

নিঃসেন্দহে এ পবিত্র স্থানের যিয়ারত একজন মু’মিনের মর্যাদা যেমন বৃদ্ধি করে তেমনি তার মাগফিরাতও করে।

কেননা এখানে বাইতুল্লাহ্, যমযম, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহীম, মিনা, মুযদালিফাহ্ ও আরাফাহসহ ঐতিহাসিক পবিত্র স্থানগুলো রয়েছে। এ ছাড়াও সালেহ্, হুদ, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক ও ইয়াকুব আ. সহ হাজার হাজার নবী রাসূলগণ এ পূণ্যভূমি ভ্রমণ করেছেন। তাঁরা তাহলীল ও তালবিয়া পড়ে পড়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক পবিত্র স্থানগুলো যিয়ারত করেছেন।

বিদায় হজের সময় রাসূল সা. আরাফতের মাঠে সমবেত মুসলিম উম্মাহকে সম্বোধন করে বলছেন, “তোমরা হজের পবিত্র স্থানসমূহে অবস্থান কর, কেননা এগুলো তোমাদের পূর্ব পুরুষদের মীরাস”। (আবু দাউদ)।

অতঃএব আমাদের উচিত যে আমরা যেন আমাদের পূর্ব পুরুষ নবী-রাসূলগণের মীরাসকে যথাযথ মূল্যায়ন করি এবং তাদের উত্তরসূরি হিসেবে তাদের অনুসরণে জীবন পরিচালনা করি।

সে দিকেই ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান হিসেবে গ্রহণ কর…” (সূরা বাকারা-১২৫)।

বিদায় হজের সময় জুমাবার হযরত জিবরাঈল আ. সর্বশেষ ঐশী বাণী নিয়ে রাসূল সা. এর কাছে উপস্থিত হন এ আরফাতের মাঠেই। তখন রাসূল সা. বিদায়ের ইঙ্গিত প্রদর্শন করে বলেছিলেন, হে মুসলিম উম্মাহ!

হয়তো এটিই তোমাদের সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ। এরপর তোমাদের সাথে আর মিলিত নাও হতে পারি। অতএব হজ সংক্রান্ত যার যে জিজ্ঞাসা আছে জেনে নিতে পার।

রাসূল সা. ইরশাদ করেন, “মসজিদে খায়েফে সত্তর জন আম্বিয়ায়ে কেরাম নামায আদায় করেছেন”। (তাবরানী)।

অন্য এক হাদীসে আসছে রাসূল সা. ‘রাওহা’ নামক স্থানের গিরিপথ থেকে হযরত ঈসা ইবনে মরয়াম আ. হজ বা ওমরাহর উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহয় আসবেন।

অতএব এখান থেকে প্রতিয়মান হয় যে যুগে যুগে সমস্ত নবী-রাসূলগণের সাথে এ ভূখণ্ডের একটা আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছিলো। তাদের সবার ধর্ম এক ও অভিন্ন ছিল। সকলেই একমাত্র মহান আল্লাহ্‌র ইবাদতের জন্য আদিষ্ট হয়েছিলেন।

রাসূল সা. ইরশাদ করেন, সমস্ত নবী রাসূলগণ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের আকিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস এক। তবে শরীয়ত যার-যার আলাদা।

এবার আসুন আমরা হজের কিছু মৌলিক উদ্দেশ্য বা শিক্ষা সম্পর্কে অবগত হই।

এক: হজের মূল উদ্দেশ্য বা শিক্ষা হলো, তাওহীদ ভিত্তিক ঐক্য গঠন করা। কেননা তাওহীদ বা একত্ববাদই হলো ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়। মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয় যে আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদার স্থাপন করবে আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন। তার চিরস্থায়ী ঠিকানা হলো জাহান্নম”। (সূরা মায়েদা-৭২)।

রাসূল সা. ইরশাদ করেন, “যে মুশরিক অবস্থায় আল্লাহ্‌র সাথে মিলিত হবে সে জাহান্নমে প্রবেশ করবে। আর যে মু’মিন অবস্থায় আল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাত করবে সে জান্নাতের অতিথি হিসেবে গণ্য হবে”।

এ ছাড়াও তাওহীদের মাধ্যমে মানুষের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। হাদীসে কুদসীতে রাসূল সা. ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ্ বলেন, “হে আদমের সন্তান! তুমি যদি শিরক বিহীন এক কুরাব বা মশক গুনাহ নিয়েও আমার কাছে আসো আমি সে পরিমাণ মাগফিরাত নিয়ে তোমার কাছে আসবো”।

দুই: হজের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য বা শিক্ষা হলো, মানুষের প্রতি ইহসান করা। যে কোন পরিস্থিতিতে নম্র ও কোমলমতি হওয়া। সর্বদা অন্যের প্রতি সদয় হওয়া। হজের মৌসুমে হযরত ওমর রা. কে সম্বোধন করে রাসূল সা. ইরশাদ করছেন, “হে ওমর! তুমি একজন শক্তিশালী বাহাদুর পুরুষ। হাজরে আসওয়াদের সামনে দূর্বল মানুষের সাথে গাদাগাদি করো না। যদি কখনও খালি অবস্থায় পাও তখন স্পর্শ করো। অন্যথায় শুধু সামনে নিয়ে তাহলীল পড়”। (আহমাদ)।

অতএব জেনে রাখুন। হজের পূর্ণ সাওয়াব পেতে চাইলে মানুষের সাথে নম্র ও ভদ্রতার সাথে চলাফেরা করতে হবে। বিশেষ করে হজের মৌসুমের মতো এ ধরনের ভিড়ে মানুষের প্রতি সদয় হোন।

রাসূল সা. ইরশাদ করেন, “নিশ্চয় আল্লাহ্‌ নম্র! এবং তিনি নম্রতাকে পছন্দ করেন। নম্র অবস্থায় এমন কিছু দান করেন যা সহিংসতা অবস্থায় দান করেন না”।

তিন: পরষ্পর ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঈমানী বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া।  হাজীগণ যখন একই সাথে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করেন, সাফা-মারওয়ার সাঈ করেন, আরফাতের মাঠে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান করেন এবং মিনা-মুযদালিফাহয় রাত যাপন করেন তখন মু’মিনের ঈমানী বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৌন্দর্যের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। সকলেই একই মা’বুদের ইবাদত করেন, একি পোষাকে সজ্জিত হয়ে একই আমল করেন।

চার: হজের চতুর্থ শিক্ষা হলো, মু’মিন-মুসলিমদের মাঝে শারফ ও মর্যাদার একমাত্র মাধ্যম হবে তাকওয়া। ধনী-গরীব, সাদা-কালো ও আরব-অনারবের ভিত্তিতে কোন মর্যাদা বা মানদণ্ড হতে পারে না। এ জন্যই বিদায় হজ শেষে প্রায় লক্ষ সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হতে একজন কালো সাহাবীকে আপন সাওয়ারীর আরোহী বানালেন এবং ঘোষণা দিলেন, “অনারবের উপর আরব বা কালো জাতির উপর সাদা জাতির কোন মর্যাদা নেই। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাধ্যম হলো তাকওয়া”।

মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্‌র কাছে সবচেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী হলো সে ব্যক্তি যে সবচেয়ে বেশী পরহেযগার”। (সূরা হুজরাত-১৩)।

পাঁচ: বেশী বেশী আল্লাহ্‌র যিকির প্রতিষ্ঠা করা। মূলত যিকিরই হলো সমস্ত ইবাদতের মূল। এ জন্য ইবনুল কাইয়িম রহ বলেন, “আমলকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দামি হলো যার মধ্যে বেশী যিকির আছে। অতএব রোযাদারদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো যার বেশী যিকির আছে। অনুরূপভাবে হাজীগণের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হাজী হলো যার বেশী যিকির আছে”।

১৯ ই যিলকদ ১৪৩৮ হি. মোতাবেক  ১১ ই  আগস্ট, ২০১৭ ইং পবিত্র মক্কা শরীফের জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীয়া ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থী মুহাম্মাদ নূরুল্লাহ সাঈদ।

 

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   পরকালের জন্য হোক কিছু সঞ্চয়   ❖   কোনো এক ক্ষণে   ❖   ঠিকানার শেষ প্রান্তে   ❖   অন্যরকম বিয়ে   ❖   ভাগ্যকে আশীর্বাদ করুন দোষারোপ নয়   ❖   সত্যের পথে   ❖   কওমি সনদ, হাইআতুল উলইয়া, বেফাক ও অন্যান্যদের দলাদলি: একটি পর্যালোচনা   ❖   ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত যুদ্ধের পেছনে আমেরিকার খরচ ৫.৬ ট্রিলয়ন ডলার!   ❖   ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি পরকীয়া   ❖   আরবের দুম্বা সমাচার